বৃষ্টিভেজা শহরে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ফিরে আসা

                                                Bs bhau
ঢাকার পুরান অংশে শীতের বিকেলগুলো অন্যরকম হয়। সূর্য ডোবার আগে ধূসর আলো যখন পুরনো দালানের জানালায় আটকে থাকে, তখন মনে হয় শহরটা যেন অতীতের কোনো চিঠি খুলে বসে আছে। সেই রকম এক বিকেলে প্রথমবার তানহাকে দেখেছিল রায়ান। চকবাজারের সরু গলির ভেতরে ছোট্ট একটি বইয়ের দোকানে কাজ করত সে। রায়ান তখন একটি অনলাইন পত্রিকার জন্য পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য নিয়ে লেখা তৈরি করছিল। সারাদিন ঘুরে ক্লান্ত হয়ে দোকানে ঢুকে সে পানি চেয়েছিল। মেয়েটি কোনো কথা না বলে কাঁচের গ্লাসে পানি এগিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তার চোখে এমন এক শান্তি ছিল যা রায়ানকে অদ্ভুতভাবে থামিয়ে দিয়েছিল। শহরে বহু সুন্দর মুখ দেখেছে সে, কিন্তু এই মেয়েটার মধ্যে অন্যরকম কিছু ছিল—এক ধরনের নীরবতা, যা মানুষের বুকের গভীরে গিয়ে লাগে। বইয়ের তাকের পাশে দাঁড়িয়ে তানহা পুরনো বই গুছাচ্ছিল। রায়ান কথা বাড়ানোর জন্য জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কি এখানে সবসময় কাজ করেন?” মেয়েটি হালকা হেসে বলেছিল, “সবসময় না, তবে পালিয়ে যাওয়ার জায়গা না পেলে এখানে আসি।” উত্তরটা শুনে রায়ান অবাক হয়েছিল। একজন মানুষ কীভাবে এত সহজে নিজের ভেতরের ক্লান্তি বলে দিতে পারে? সেদিন আর বেশি কথা হয়নি। কিন্তু দোকান থেকে বের হওয়ার পরও রায়ানের মাথায় বারবার মেয়েটার কণ্ঠ ভেসে উঠছিল। পরদিন সে আবার গিয়েছিল, অজুহাত ছিল একটি পুরনো কবিতার বই খোঁজা। তানহা বুঝেছিল ছেলেটি বইয়ের চেয়ে তার সঙ্গে কথা বলতেই বেশি আগ্রহী। তবু সে বিরক্ত হয়নি। ধীরে ধীরে তাদের কথা বাড়তে লাগল। রায়ান জানল, তানহার বাবা একসময় এই দোকানের মালিক ছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর দোকানটা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব তার কাঁধে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য পড়লেও সংসারের চাপে পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। অন্যদিকে রায়ান ছিল একেবারে উল্টো স্বভাবের—চঞ্চল, অস্থির, নতুন কিছু করার নেশায় ডুবে থাকা মানুষ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দুইজনের অসম্পূর্ণতাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ হলে তারা কখনো ছাদে বসে চা খেত, কখনো বুড়িগঙ্গার ধারে হাঁটত। রায়ান বুঝতে পারছিল, সে ধীরে ধীরে তানহার নীরবতার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। একদিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি এত চুপচাপ কেন?” তানহা একটু হেসে বলেছিল, “সব মানুষ শব্দ দিয়ে ভালোবাসতে পারে না, কেউ কেউ নীরবতা দিয়েও পারে।” সেই উত্তর শোনার পর রায়ানের মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের ভাষা হয়তো এটাই। দিন যেতে লাগল। তাদের সম্পর্কের কথা কেউ জানত না, কিন্তু পুরান ঢাকার গলিগুলো যেন সব বুঝতে পারত। যে চায়ের দোকানে তারা বসত, সেই দোকানদার পর্যন্ত একদিন মুচকি হেসে বলেছিল, “ভাই, আপুরে ছাড়া তো এখন আর আপনাকে দেখা যায় না।” রায়ান তখন লজ্জা পেয়ে হেসেছিল, আর তানহা মাথা নিচু করে চায়ে চুমুক দিয়েছিল। সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের পৃথিবী হয়ে উঠছিল। কিন্তু সুখের সময়গুলো সবসময় নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়। এক রাতে রায়ানের অফিস থেকে ফোন এলো, তাকে ছয় মাসের জন্য কলকাতায় পাঠানো হবে। ক্যারিয়ারের জন্য সুযোগটা অনেক বড় ছিল। সবাই তাকে অভিনন্দন দিলেও তার বুকের ভেতরে কেমন শূন্যতা নেমে এলো। তানহাকে খবরটা দেওয়ার সময় সে ভেবেছিল মেয়েটি হয়তো কাঁদবে, কিন্তু তানহা শুধু বলেছিল, “মানুষের স্বপ্ন থামিয়ে রাখা উচিত না।” রায়ান কষ্ট পেয়েছিল। সে চেয়েছিল তানহা অন্তত একবার বলুক, “যেও না।” কিন্তু তানহা কিছুই বলেনি। শুধু সেদিন দোকান বন্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। রায়ান বুঝতে পারেনি, মেয়েটার নীরবতার ভেতরে কী পরিমাণ ঝড় লুকিয়ে ছিল। কলকাতায় যাওয়ার আগের রাতে রায়ান তাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিল। প্রথম পাতায় লিখেছিল, “যেদিন আমাকে খুব মনে পড়বে, সেদিন এখানে কিছু লিখে রেখো।” তানহা ডায়েরিটা বুকের কাছে চেপে ধরে ছিল, কিন্তু কিছু বলেনি। পরদিন ভোরে যখন রায়ান ট্রেনে উঠল, তখন সে জানত না এই বিদায় তাদের জীবনকে কতটা বদলে দেবে। কলকাতায় নতুন কাজ, নতুন শহর, নতুন ব্যস্ততা—সবকিছু তাকে ঘিরে ধরেছিল। তবু প্রতিদিন রাতে সে ফোন করত। প্রথম কয়েক সপ্তাহ তানহা কথা বলত ঠিকই, কিন্তু ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ বদলে যেতে লাগল। আগের মতো হাসত না, দীর্ঘ কথা বলত না। রায়ান ভেবেছিল হয়তো দোকানের চাপ বেড়েছে। কিন্তু আসল সত্যিটা আরও কঠিন ছিল। তানহার পরিবার তার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক হয়েছিল। তানহা বারবার না বললেও কেউ তার কথা শুনছিল না। সে রায়ানকে কিছু বলেনি, কারণ সে জানত ছেলেটি নিজের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করছে। কিন্তু নীরবে নীরবে সে ভেতর থেকে ভেঙে যাচ্ছিল। এক রাতে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে তানহা দোকানের ভেতরে বসে ডায়েরিতে লিখেছিল, “কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু পাওয়া যায় না।” ঠিক সেই রাতেই রায়ান ফোন করেছিল। তানহা ফোন ধরেনি। কারণ তার চোখের জল লুকানোর মতো শক্তি তখন আর ছিল না। পরদিন সকালে রায়ান বারবার ফোন করেও না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠল। কয়েকদিন পর তানহা অবশেষে ফোন ধরে শুধু বলেছিল, “তুমি তোমার কাজ শেষ করো, আমার জন্য থেমে থেকো না।” কথাটা শুনে রায়ানের বুক কেঁপে উঠেছিল। সে বুঝতে পারছিল কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। কিন্তু হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সে কিছুই করতে পারছিল না। সেই প্রথমবার তার মনে হয়েছিল, জীবনে সফল হওয়ার চেয়ে প্রিয় মানুষটাকে পাশে রাখা অনেক বেশি জরুরি। অথচ তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছিল।

দুই মাস পর রায়ান হঠাৎ কোনো খবর না দিয়ে ঢাকায় ফিরে এলো। সে ঠিক করেছিল, তানহাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করবে। ছোট একটা বাসা নেবে, দোকানটা বড় করবে, আর সব ঝামেলার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কিন্তু পুরান ঢাকার সেই গলিতে পৌঁছে সে যেন অন্য এক পৃথিবী দেখল। দোকান বন্ধ। ধুলোমাখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাশের দোকানদার তাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনি জানেন না? আপুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।” কথাটা শুনে রায়ানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তানহার বাসার সামনে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরে ঢোকার সাহস পায়নি। শেষ পর্যন্ত রাতে তানহাই তাকে ফোন করল। কণ্ঠে অদ্ভুত ক্লান্তি ছিল। “তুমি কেন এসেছ?” রায়ান কাঁপা গলায় বলেছিল, “তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।” ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর তানহা বলল, “সব গল্প একসাথে শেষ হয় না রায়ান।” রায়ান সেই রাতে প্রথমবার কেঁদেছিল। একজন পুরুষ যখন সত্যিকারের অসহায় হয়ে পড়ে, তখন তার কান্নার শব্দ খুব নিঃশব্দ হয়। কয়েকদিন পর তারা শেষবারের মতো দেখা করল সদরঘাটের কাছে। নদীর পানি কালো হয়ে ছিল, আকাশে মেঘ জমেছিল। তানহা সাদা শাড়ি পরেছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন অনেক বছর একা কেঁদেছে। রায়ান তার হাত ধরে বলেছিল, “চলো পালিয়ে যাই।” তানহা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলেছিল, “বাস্তব জীবন সিনেমা না।” তারপর ব্যাগ থেকে সেই ডায়েরিটা বের করে দিল। “এটা তোমার কাছে থাকুক।” রায়ান ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে গিয়ে দেখল প্রতিটি পাতায় তার জন্য লেখা অগণিত কথা। কোথাও অভিমান, কোথাও ভয়, কোথাও অসীম ভালোবাসা। শেষ পাতায় লেখা ছিল, “তুমি যদি কোনোদিন ফিরে এসে আমাকে না পাও, তাহলে মনে কোরো আমি তোমাকে কম ভালোবাসিনি, শুধু সময়টা আমাদের পক্ষে ছিল না।” কথাগুলো পড়ে রায়ানের মনে হয়েছিল তার বুকের ভেতর কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে তানহাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল, কিন্তু মেয়েটি ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিয়েছিল। “আমাকে ভুলে যাও।” এই চারটি শব্দ বলার সময় তার চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। তারপর সে চলে গিয়েছিল। রায়ান অনেকক্ষণ নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই রাতে ঢাকায় প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল। শহরের সব রাস্তা ভিজে গিয়েছিল, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব বৃষ্টি বুঝি তার ভেতরেই নামছে। এরপর দীর্ঘ সময় তারা আর যোগাযোগ করেনি। তানহার বিয়ে হয়ে গেল। রায়ান আবার কাজে ডুবে গেল। কয়েক বছরের মধ্যে সে পরিচিত লেখক হয়ে উঠল। তার লেখা প্রেমের গল্প মানুষ কাঁদতে কাঁদতে পড়ত। সবাই ভাবত এত গভীর ভালোবাসার অনুভূতি সে কোথা থেকে পায়। কেউ জানত না, প্রতিটি গল্পের পেছনে লুকিয়ে আছে পুরান ঢাকার এক নীরব মেয়ের মুখ। রায়ান বহুবার চেষ্টা করেছিল অন্য কাউকে ভালোবাসতে, কিন্তু পারেনি। কারণ কিছু মানুষ জীবনে একবারই আসে, আর চলে গেলেও পুরো জীবনজুড়ে থেকে যায়। এক শীতের সকালে বইমেলায় নিজের নতুন বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে বসেছিল রায়ান। মানুষের ভিড়, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সাংবাদিকদের প্রশ্ন—সবকিছুর মাঝেও তার মন কোথাও স্থির ছিল না। অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে হঠাৎ সে ভিড়ের মধ্যে পরিচিত একটি মুখ দেখতে পেল। তানহা। অনেক বছর পর। সময় তাকে আরও শান্ত করে দিয়েছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু সেই নীরবতা এখনো আগের মতোই সুন্দর। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গিয়েছিল। রায়ানের মনে হয়েছিল পৃথিবী থেমে গেছে। অনুষ্ঠান শেষে তানহা এগিয়ে এসে শুধু বলেছিল, “ভালো আছ?” রায়ান হেসেছিল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কতটা ভাঙা শব্দ ছিল, তা হয়তো শুধু তানহাই বুঝেছিল। তারা মেলার বাইরে এসে কিছুক্ষণ হাঁটল। জানা গেল, তানহার সংসার টেকেনি। স্বামী অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। অনেক অপমান সহ্য করার পর সে আলাদা হয়ে গেছে। কথাগুলো বলতে বলতে তানহা হাসছিল, কিন্তু সেই হাসিতে জীবনের ক্লান্তি মিশে ছিল। রায়ান তার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, মানুষ কেন ভালোবাসার মানুষদের এত কষ্ট দেয়? সেই রাতে তারা অনেক কথা বলল। পুরোনো স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া সময়, অপূর্ণ স্বপ্ন—সবকিছু ফিরে এলো। বিদায়ের সময় রায়ান ধীরে করে বলেছিল, “এবার আর হারিয়ে যেও না।” তানহা কিছু বলেনি, শুধু চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে নিয়েছিল। কখনো কখনো মানুষের নীরবতাই সবচেয়ে বড় সম্মতি হয়।

তারপরের দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। রায়ান আর তানহা আবার দেখা করতে শুরু করল, তবে এবার তাদের সম্পর্কের ভেতরে কিশোর বয়সের উচ্ছ্বাসের চেয়ে বেশি ছিল পরিণত এক শান্তি। তারা জানত, জীবন সবসময় গল্পের মতো সুন্দর হয় না, তবু কিছু মানুষকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়া উচিত। তানহা আবার বইয়ের দোকানটা চালু করল। রায়ান প্রায় প্রতিদিন সেখানে যেত। পুরোনো কাঠের তাক, ধুলোমাখা বই, জানালার পাশে রাখা মানিপ্ল্যান্ট—সবকিছু আগের মতোই ছিল, শুধু সময় বদলে গিয়েছিল। একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার পর তানহা হঠাৎ বলেছিল, “আমরা যদি তখন একটু সাহসী হতাম?” রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিয়েছিল, “তাহলে হয়তো আজকের এই মূল্যটা বুঝতাম না।” কথাটা শুনে তানহা মৃদু হেসেছিল। তাদের সম্পর্ক এবার আর তাড়াহুড়ো করে এগোয়নি। তারা ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনে জায়গা করে নিচ্ছিল। রায়ান তানহার জন্য রান্না শিখেছিল, আর তানহা আবার লেখালেখি শুরু করেছিল। মাঝে মাঝে তারা রাতে ছাদে বসে শহরের আলো দেখত। পুরান ঢাকার ওপর দিয়ে যখন ঠান্ডা বাতাস বয়ে যেত, তখন মনে হতো এত বছরের কষ্ট বুঝি একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো—সুখ মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়। কারণ যে মানুষ অনেক কষ্ট দেখেছে, সে সুখকেও বিশ্বাস করতে ভয় পায়। তানহার ভেতরেও সেই ভয় ছিল। সে বারবার ভাবত, আবার যদি সব হারিয়ে যায়? এক রাতে সে রায়ানকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কি নিশ্চিত, এবারও আমাকে ছেড়ে যাবে না?” রায়ান তার হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল, “মানুষ সবসময় পাশে থাকতে পারে না, কিন্তু ভালোবাসা থাকলে ফিরে আসতে পারে।” সেই উত্তর শুনে তানহার চোখ ভিজে উঠেছিল। কয়েক মাস পর রায়ান সিদ্ধান্ত নিল, এবার আর কোনো অপেক্ষা না। সে তানহাকে নিয়ে ছোট্ট করে বিয়ে করবে। জমকালো আয়োজন নয়, শুধু কাছের কিছু মানুষ আর শান্ত একটা বিকেল। বিয়ের দিন ঠিক হলো পৌষের শেষ সপ্তাহে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই দিনটাতেও হালকা বৃষ্টি হয়েছিল—যেন প্রকৃতি তাদের গল্পের সব স্মৃতি একসাথে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। তানহা লাল শাড়ি পরে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল এত বছর পর হয়তো জীবন তাকে একটু দেরিতে হলেও সুখ দিতে রাজি হয়েছে। বিয়ের আসরে রায়ান তার দিকে তাকিয়ে ছিল এমনভাবে, যেন পৃথিবীতে আর কিছু দেখার নেই। কাজি সাহেব যখন কবুল বলতে বললেন, তানহার গলা কেঁপে উঠেছিল। সেই একটি শব্দ উচ্চারণ করার সময় তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। হয়তো সেই কান্নার ভেতরে ছিল হারানো সময়ের আক্ষেপ, আবার ফিরে পাওয়ার স্বস্তি, আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি। বিয়ের পর তারা খুব সাধারণ জীবন বেছে নিল। বড় বাড়ি না, দামি গাড়ি না—শুধু ছোট্ট একটা বাসা, অনেক বই, বারান্দায় কিছু গাছ আর একসাথে বিকেলের চা। রায়ান এখনো গল্প লিখত, কিন্তু তার লেখাগুলো বদলে গিয়েছিল। আগে তার গল্পে বিচ্ছেদের কষ্ট বেশি থাকত, এখন সেখানে ফিরে পাওয়ার আলো ছিল। একদিন এক পাঠক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার প্রেমের গল্পগুলো এত বাস্তব লাগে কেন?” রায়ান শুধু হেসেছিল। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর ভাষায় দেওয়া যায় না। সেদিন রাতে বাসায় ফিরে সে দেখল তানহা বারান্দায় বসে বই পড়ছে। বাতাসে তার চুল উড়ছে। বহু বছর আগে বইয়ের দোকানে প্রথম দেখা সেই মেয়েটার মতোই লাগছিল তাকে। রায়ান চুপচাপ পাশে গিয়ে বসেছিল। তানহা বই বন্ধ করে জিজ্ঞেস করেছিল, “কি দেখছ?” রায়ান ধীরে করে বলেছিল, “আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পটা।” তানহা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করেছিল। দূরে কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসছিল, আকাশে মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঠছিল। সেই মুহূর্তে তাদের মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে সব প্রেম একসাথে শেষ হয়ে যায় না। কিছু প্রেম হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে, আরও গভীর হয়ে, আরও সত্যি হয়ে। আর মানুষ তখন বুঝতে শেখে—ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া না, বরং হাজার ভাঙনের পরও একই মানুষকে আবার নিজের জীবনে চাইতে পারা।

Comments