ছায়া জানলা


গল্পের নাম: ছায়া জানলা

​শহরের শেষ প্রান্তে পুরনো একতলা বাড়িটাতে অঞ্জন একা থাকে। পেশায় সে লেখক, তাই নির্জনতা তার প্রিয়। কিন্তু গত তিন দিন ধরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে।
​প্রতিদিন রাত ঠিক ১২টা ৪ মিনিটে অঞ্জনের শোবার ঘরের জানলার ওপাশে একটা ছায়া এসে দাঁড়ায়। পর্দা টানা থাকলেও বোঝা যায় কেউ একজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম দিন অঞ্জন ভেবেছিল হয়তো গাছের ছায়া, কিন্তু আজ সে নিশ্চিত—জানলার ওপাশে কোনো মানুষ আছে।
​অঞ্জন সাহস সঞ্চয় করে জানলার পর্দাটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেউ নেই। শুধু বাগানের হাসনাহেনা ফুলের তীব্র ঘ্রাণ নাকে আসছে। অঞ্জন জানলাটা আটকে দিয়ে আবার লিখতে বসল। কিন্তু ঠিক তখনই কাঁচের ওপাশ থেকে একটা মৃদু আওয়াজ এল— 'ঠক... ঠক... ঠক...'
​অঞ্জনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "কে ওখানে?"
​ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। শুধু জানলার কাঁচের ওপর বাষ্প জমেছে, আর সেখানে আঙুল দিয়ে কেউ বড় বড় করে লিখেছে— 'গল্পটা শেষ করো।'
​অঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে গত এক বছর ধরে একটা রহস্য উপন্যাস লিখছে যা সে শেষ করতে পারছে না। প্রধান চরিত্রের মৃত্যু কীভাবে হবে, সেটা কিছুতেই মাথায় আসছিল না তার। পরদিন সকালে অঞ্জন জানলাটা খুলে দেখল, বাইরে কোনো পায়ের ছাপ নেই, কোনো বাষ্পের দাগও নেই।
​সেদিন রাত থেকে অঞ্জন পাগলের মতো লিখতে শুরু করল। তিন দিন পর গল্পটা শেষ হলো। গল্পের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়—প্রধান চরিত্রটি তার জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নিজেরই মৃতদেহের অপেক্ষায়।
​গল্পটা শেষ করার পর অঞ্জন একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। সেদিন রাতে আর কোনো ছায়া এল না। তবে সকালে জানলা পরিষ্কার করতে গিয়ে সে চমকে উঠল। কাঁচের ঠিক কোণায় ছোট করে খোদাই করা ছিল একটা নাম— যা তার নিজেরই ছদ্মনাম।
​অঞ্জন বুঝল, কিছু গল্প শেষ হওয়ার জন্য লেখক নয়, গল্পের চরিত্ররাই তাগাদা দেয়।

Comments