অরণ্যের শেষ প্রদীপ
বর্ষার শেষ দিক। আকাশে তখনো কালো মেঘের ভাঁজ, মাঝে মাঝে দূরে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। নদীর পাড়ের ছোট্ট গ্রামটির নাম ছিল শালবন। গ্রামের চারদিকে ঘন জঙ্গল, পুরোনো বটগাছ আর কুয়াশায় ঢাকা সরু পথ। সন্ধ্যা নামলেই মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে দিত। কারণ জঙ্গলের ভেতরে ছিল এক পরিত্যক্ত রাজবাড়ি—যাকে সবাই বলত “অন্ধকার মহল”। লোকমুখে শোনা যেত, বহু বছর আগে সেখানে বাস করতেন জমিদার রুদ্রনারায়ণ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধনী, কিন্তু নিষ্ঠুর। গ্রামের মানুষদের কষ্ট দিয়ে সম্পদ জমাতেন। এক রাতে হঠাৎ রাজবাড়িতে আগুন লাগে। জমিদার ও তাঁর পরিবার আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপর থেকে গভীর রাতে রাজবাড়ির ভাঙা জানালায় নাকি আলো জ্বলে উঠত। এই গল্পগুলো শুনেই বড় হয়েছে গ্রামের ছেলে আরিয়ান। বয়স মাত্র ষোলো, কিন্তু তার কৌতূহল ছিল অদ্ভুত। অন্যরা যেখানে ভয় পেত, সেখানে সে রহস্য খুঁজত। এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আরিয়ান তার দাদার কাছে বসে ছিল। দাদা পুরোনো হারিকেনের আলোয় বিড়ি টানছিলেন। “দাদু,” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল, “অন্ধকার মহলের গল্প কি সত্যি?” দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “সব গল্প মিথ্যে হয় না রে। আমি নিজের চোখে সেই আলো দেখেছি।” “তুমি কখনো ভেতরে গিয়েছিলে?” “না। যারা গেছে, তারা আর আগের মতো ফিরে আসেনি।” কথাটা শুনে আরিয়ানের চোখে ভয় নয়, বরং আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। সেদিন রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল—সে অন্ধকার মহলে যাবে। পরদিন গভীর রাতে, হাতে একটা পুরোনো টর্চ আর ব্যাগে কিছু শুকনো খাবার নিয়ে আরিয়ান বেরিয়ে পড়ল। আকাশে চাঁদ ছিল না। চারপাশে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। জঙ্গলের পথ যত গভীরে যাচ্ছিল, বাতাস তত ঠান্ডা হয়ে উঠছিল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল—গাছগুলোর ফাঁকে যেন কারও ছায়া নড়ছে। টর্চের আলো ফেলতেই কিছুই নেই। কিছু দূর এগিয়ে সে রাজবাড়িটা দেখতে পেল। ভাঙা দেয়াল। শেওলায় ঢাকা সিঁড়ি। জানালার কাঠগুলো অর্ধেক পচে গেছে। অথচ সত্যিই—উপরতলার এক কোণায় ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলছে। আরিয়ানের বুক ধকধক করতে লাগল। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। দরজাটা ঠেলে খুলতেই কড়কড় শব্দ হলো। ভেতরে ধুলো আর মাকড়সার জাল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—মেঝেতে তাজা পায়ের ছাপ। “এখানে কেউ আছে…” সে ফিসফিস করল। হঠাৎ ওপর থেকে কারও হাঁটার শব্দ ভেসে এল। ঠক… ঠক… ঠক… আরিয়ান সাহস করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। করিডোরের শেষে একটি দরজা আধখোলা। সেখান থেকেই আলো আসছে। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই সে জমে গেল। এক বৃদ্ধ লোক মোমবাতির সামনে বসে কিছু লিখছেন। লোকটির লম্বা সাদা দাড়ি, চোখে গোল চশমা। যেন বহুদিনের ক্লান্তি জমে আছে মুখে। “ভেতরে এসো,” বৃদ্ধ না তাকিয়েই বললেন। আরিয়ান অবাক। “আপনি জানলেন আমি এখানে?” বৃদ্ধ ধীরে মুখ তুললেন। “আমি বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছি তোমার মতো কারও জন্য।” “আপনি কে?” “আমার নাম অমরেশ। আমি ছিলাম এই রাজবাড়ির হিসাবরক্ষক।” আরিয়ান হতভম্ব। “কিন্তু… এই বাড়ির তো সবাই মারা গেছে!” বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। “সবাই না।” তারপর তিনি ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর সত্য বললেন। জমিদার রুদ্রনারায়ণ গ্রামের মানুষের কাছ থেকে শুধু অর্থই লুট করেননি—তাদের জীবনও ধ্বংস করেছিলেন। বিদ্রোহের ভয় থেকে তিনি গ্রামের বহু মানুষকে গোপনে হত্যা করিয়েছিলেন। অমরেশ সব জানতেন, কিন্তু ভয়ে মুখ খোলেননি। সেই আগুনের রাতে গ্রামবাসীরা প্রতিশোধ নিতে আসে। রাজবাড়িতে আগুন লাগে। জমিদার মারা যায়। কিন্তু অমরেশ পালিয়ে বেঁচে যান। “তাহলে আপনি এখানে লুকিয়ে ছিলেন এতদিন?” “হ্যাঁ,” বৃদ্ধ বললেন। “পাপের শাস্তি থেকে পালাতে পারিনি। এই বাড়িই আমার কারাগার।” বাইরে হঠাৎ প্রবল বাতাস উঠল। জানালাগুলো ধড়াম ধড়াম করে বন্ধ হতে লাগল। তারপর করিডোরে কারও কান্নার শব্দ শোনা গেল। একটি মেয়ের কণ্ঠ। “আমাদের বিচার কে করবে…” আরিয়ান আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, “ওরা এসেছে।” “ওরা মানে?” “যারা মারা গিয়েছিল।” হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল। চারপাশ অন্ধকার। তারপর একে একে অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি দেখা দিতে লাগল। পোড়া মুখ। শূন্য চোখ। তারা ধীরে ধীরে ঘর ঘিরে দাঁড়াল। আরিয়ান চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। একটি ছায়া সামনে এগিয়ে এল। “সত্য প্রকাশ করো…” বৃদ্ধ কাঁপতে লাগলেন। “আমি ভুল করেছি… আমি ভয় পেয়েছিলাম…” “ভয় তোমাকে মুক্তি দেবে না।” আরিয়ান বুঝতে পারল—এরা প্রতিশোধ নয়, স্বীকারোক্তি চায়। সে দ্রুত বৃদ্ধের দিকে তাকাল। “আপনি সব লিখে ফেলুন। গ্রামের মানুষকে সত্য জানাতে হবে।” বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে পুরোনো ডায়েরি খুললেন। জমিদারের সব অপরাধ লিখতে শুরু করলেন। ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। ছায়াগুলো একে একে মিলিয়ে যেতে লাগল। শেষে সেই মেয়েটির কণ্ঠ আবার শোনা গেল— “সত্যই মুক্তি।” ভোর হওয়ার আগেই আরিয়ান রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তার হাতে সেই ডায়েরি। পরদিন গ্রামের সবাইকে সে সব খুলে বলল। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু ডায়েরির পাতায় জমিদারের নিজের সই, হত্যার হিসাব আর গোপন কবরের বর্ণনা ছিল। কিছুদিন পর সত্যিই জঙ্গলের ভেতরে কবর পাওয়া গেল। গ্রামজুড়ে শোরগোল পড়ে গেল। আর অদ্ভুতভাবে, সেই রাতের পর থেকে আর কখনো অন্ধকার মহলের জানালায় আলো দেখা যায়নি। বহু বছর পরে, বড় হয়ে আরিয়ান একজন লেখক হয়। মানুষ তাকে রহস্যগল্পের জন্য চিনত। কিন্তু তার সবচেয়ে বিখ্যাত বইটির নাম ছিল — “অরণ্যের শেষ প্রদীপ”। বইয়ের শেষ লাইনে সে লিখেছিল— “অন্ধকার কখনো আলোকে হারাতে পারে না, যদি কেউ সত্য বহন করার সাহস রাখে।”
Product Name: Wireless Headphones Bluetooth 5.2 Neckband Earphones
Product Price: ৳276
Discount Price: ৳207
Comments
Post a Comment